কেমন পড়াশুনা, কেমন বেতন, কেমন ক্যারিয়ার : পর্ব 2: লাইফ সাইন্স বা বায়োলজি



নটরডেম কলেজে পড়াকালীন সময়ে একজন বিখ্যাত জোওলোজি টিচারকে পেয়েছিলাম যিনি আমাদের ওই সময়কার জোওলোজি বইয়ের লিখক ছিলেন। জোওলোজি এর মতো একটা বিষয়কে অমন করে পড়াতেন যে, ক্লাস করার পর আর এটাকে মোটেই কঠিন মনে হতো না। অনেক সহজ মনে হতো। উনি একদিন একটা গল্প বলেছিলেন। ঢাকা শহরের আরেকটা স্বনামধন্য সরকারি কলেজে গিয়েছিলেন HSC পরীক্ষার জোওলোজি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা নেবার জন্যে। ওই কলেজে যদিও দেশের সব চেয়ে অন্যতম ভালো ভালো স্টুডেন্টগুলি ভর্তি হতো, কিন্তু যেহেতু সরকারি কলেজ প্রাকটিক্যাল তেমন একটা হতো না। পরীক্ষার দিন স্যার একটা স্টুডেন্টকে বললেন ব্যাঙ ব্যবচ্ছেদ করতে। ওই ছাত্র ব্যাঙ কেটে-কুটে অস্থির। স্যার জিজ্ঞেস করলো ব্যাঙ এর হৃৎপিন্ড দেখাতে। ওই ছাত্র তো আসলে হৃৎপিন্ড সহ কেটে-কুটে ভ্যানিশ করে দিয়েছে। স্যার এর জিজ্ঞাসার জবাবে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো "ওওই যে স্যার"। স্যার বললো, আমি তো দেখিনা। এরপর আবারো তার উত্তর "ওই যে স্যার! ওওই যে!"। স্যার তো যা বুঝার বুঝেই গেছেন, যেহেতু ব্যাঙ কিভাবে কাটতে তা সে জানেনা। আশা করি আপনারাও এর মধ্যেই ওই ছাত্রের অবস্থা বুঝতে পারছেন। বায়োলজি সাবজেক্টটার কথা মনে হলেই স্যার এর কথা এবং ওনার সেই গল্পটা মনে পরে।
আজকে আমরা লাইফ সাইন্স রিলেটেড কিছু আলোচনা করবো। লাইফ সাইন্স বা বায়োলজিতে জার্মানিতে কি কি সুবিধা আছে, জব ফিল্ড কেমন, বেতন কেমন, কোন কোন ক্ষেত্রে জব পাওয়া যেতে পারে, PR পাবার সুযোগ কতোটুকু এই ব্যাপারগুলি নিয়ে কথা বলব।
বায়োলজিতে জব ফিল্ড কোথায়:
বায়োলজির জব ফিল্ড আসলে অনেক ব্যাপক। একদিকে যেমন অনেক কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠানে এই ফিল্ড এর কাজ থাকে, আবার খুব ছোট ছোট কোম্পানিতেও থাকে। যেমন ধরেন, আপনি যদি মলিকুলার বায়োলজি নিয়ে কাজ করতে চান, তা হলে এটার জন্যে অনেক কমপ্লেক্স কোম্পানিতে কাজ করতে হতে পারে। এছাড়া বায়োলজি অনেক সময় অন্য ফিল্ড যেমন কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স বা ফার্মাসির মতো ফিল্ড এর সাথেও ওভারলেপ করে।
যে ধরণের অর্গানাইযেশনগুলিতে বায়োলজি ফিল্ড এর জব বেশি থাকে:
জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান Arbeitsagentur এর দেয়া তথ্যমতে বায়োলজি ফিল্ড এর বেশিরভাগ জব নিচের ৬ টি ক্ষেত্রে বেশি:
১. ইউনিভার্সিটি এবং রিসার্চ সেন্টার
২. ঔষুধ এবং কেমিকাল প্রস্তুতকারী কোম্পানি গুলিতে
৩. স্বাস্থ্য খাতে
৪. বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা এবং ন্যাচারাল পার্ক গুলিতে
৫. পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং পরিবেশ দপ্তরে
৬. নেচার মিউজিয়াম
এছাড়াও প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি, মার্কেটিং এবং প্রজেক্ট মানাজেমেন্টের মতো জায়গাগুলিতেও বায়োলজি বা লাইফ সাইন্স এর কর্ম ক্ষেত্র আছে।
বেতন কেমন:
বায়োলজি ফিল্ড এর বেতন অনেক ভেরি করে। এটা বছরে ৩৫,০০০ ইউরো থেকে ৭০,০০০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণত কেউ ব্যাচেলর'স ডিগ্রী করে জব শুরু করলে তার বেতন মাসে শুরুতে ৩০৫১ ইউরো থেকে ৩২৭৭ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। মাস্টার'স ডিগ্রী করে জব শুরু করলে শুরুর বেতন ৪০৭৪ ইউরো থেকে ৪৩৮৫ ইউরো হতে পারে প্রতি মাসে।
ইস্ট জার্মানিতে বেতন কম, ওয়েস্ট জার্মানিতে বেতন বেশি:
ইস্ট জার্মানিতে মাসিক বেতন ৩৫০০-৩৭০০ ইউরো। আর অন্য দিকে ওয়েস্ট জার্মানিতে মাসিক বেতন প্রায় ১০০০ ইউরো বেশি। জার্মানির স্টেট হেসেন যেখানে ফ্রাঙ্কফুর্ট অবস্থিতি, ওই স্টেট এ বায়োলজি ফিল্ড এর বেতন জার্মানির মধ্যে সব চেয়ে বেশি। এটা মাসে প্রায় ৫০০০ ইউরো এর মত।
বায়োটেকনোলজি:
বায়োটেকনোলজি লাইফ সাইন্স বা বায়োলজি ফিল্ড এর একটা অংশ ধরা হয়। এটা হলো বায়োলজি, মেডিসিন, কেমিস্ট্রি এবং টেকনোলজি মিলিয়ে একটা ডিসিপ্লিন। এই ফিল্ডটা বর্তমানে খুব ভালো। চেষ্টা করবেন এই ফিল্ড এর কোনো কোর্স এ ভর্তি হতে। এটার জব প্রসপেক্ট অনেক ভালো।
বায়োটেকনোলজি ফিল্ড এর বেতন:
একজন কোম্পানির মালিকের উপার্জন মাসে প্রায় ২০,০০০ ইউরো। উপরের দিকে ম্যানেজার এর মতো পসিশনএ বেতন প্রায় ১৩,০০০ ইউরো প্রতি মাসে। যারা পেশা শুরু করেন তাদের বেতন গড়ে ৪,০০০-৪,৯০০ ইউরো প্রতি মাসে। যারা ল্যাব টেকনিসিয়ান তাদের বেতন মাসে ২৭০০ ইউরো এর মতো। যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের বেতন গড়ে ১২০০ - ১৮০০ ইউরো মাসে বেশি হয়ে থাকে।
ছোট কোম্পানিতে বেতন কম হয়, বড় কোম্পানিতে বেতন বেশি হয়।
জব পাবার সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্যে টিপস:
আপনি একজন বিদেশী হিসেবে প্রথম কাজ হবে জার্মান ভাষা ভালো করে রপ্ত করা। এতে আপনার জার্মানিতে বায়োলজি ফিল্ড এ জব পাবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। আপনাকে অবশ্যই অনেক ভালো রেজাল্ট করতে হবে। আপনি খুব চেষ্টা করবেন পড়াশুনা চলাকালীন সময় একটা ইন্টার্নশীপ করার জন্যে কোথাও।
আপনি অন্য কোনো একটা ফিল্ড এ মাস্টার'স স্টাডি করতে পারেন। এই রকম ফিল্ড হতে পারে বিজনেস, কমিউনিকেশন এর মতো স্টাডি ফিল্ড। এতে আপনার জব পাওয়ার চান্স অনেক বেড়ে যাবে।
উপসংহার:
আসলে বায়োলজি ফিল্ড এর জব পাওয়াটা একটু চ্যালেঞ্জিং। তবে পৃথিবীতে কোনো কিছুই এতো সহজ না। আপনার যদি মোটিভেশন থাকে, দৃঢ় মনোবল থাকে আর সেই অনুযায়ী আপনি শ্রম দেন, তাহলে সাফল্য ধরা দিবেই। পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষ দিয়েই এগিয়ে যাবে। আপনিও পারবেন যদি মেধা এবং শ্রম দিতে পারেন।
পরিশেষ: পরবর্তীতে বায়োলজি ফিল্ড এর জন্যে জার্মান স্টাইল এ মোটিভেশন লেটার নিয়ে লিখার চেষ্টা করবো।
ধন্যবাদ!

©️ ড. এম. কবীর , জার্মানি

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url